দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের তাফতান ও গাবদ-রিমদান সীমান্ত দিয়ে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে ইসলামাবাদ। এতে দুই দেশের সীমান্তের উভয় পাশে আটকে পড়েছে পণ্যবাহী ট্রাক। সীমান্ত বন্ধের কারণ নিয়ে পাকিস্তান ও ইরান ভিন্ন ব্যাখ্যা দিলেও সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং দুই দেশের বৃহত্তর কৌশলগত সম্পর্ককে এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
শনিবার এ সিদ্ধান্তের বিষয়টি সামনে আসে। বেলুচিস্তানের রাজধানী কোয়েটার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি জানিয়েছে, সীমান্তের দুই পাশে প্রায় দুই হাজার ট্রাক আটকা পড়েছে। তবে ইরানি সংবাদ সংস্থা ওয়ানার (WANA) প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাবদ-রিমদান সীমান্ত দিয়ে যাত্রী চলাচল অব্যাহত রয়েছে।
পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি। বেলুচিস্তানের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও আলজাজিরা কোনো বক্তব্য পায়নি।
তাফতান সীমান্ত যে চাগাই জেলায় অবস্থিত, সেই জেলার উপকমিশনার বখতিয়ার ইসমাইল সীমান্ত বন্ধের সিদ্ধান্তকে নিরাপত্তাব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, সন্ত্রাসবাদবিরোধী কার্যক্রমে সহায়তা এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে সাময়িকভাবে সীমান্ত বন্ধ রাখা হয়েছে। কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত হলে সীমান্ত আবার খুলে দেওয়া হবে।
বেলুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমবিষয়ক উপদেষ্টা শহিদ রিন্দও একই দিন জানান, নিরাপত্তা উদ্বেগ মোকাবিলা, চোরাচালান প্রতিরোধ এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কার্যকর করতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনার (IRNA) বরাতে জানা গেছে, তিনি বলেছেন, কিছু কারিগরি সমস্যা এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা বাস্তবায়নের প্রয়োজনেই সাময়িকভাবে সীমান্তপারের চলাচল ও বাণিজ্য বন্ধ রাখা হয়েছে।
বেলুচিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করা কোয়েটাভিত্তিক স্বাধীন গবেষক ইমতিয়াজ বেলুচের মতে, নিরাপত্তা উদ্বেগের পাশাপাশি আরও বিস্তৃত কৌশলগত বিবেচনাও এ সিদ্ধান্তের পেছনে থাকতে পারে। ইরানের ওপর মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাবও এতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
ইরানের সেন্টার ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চ অ্যান্ড মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের পারস্য উপসাগরবিষয়ক গবেষণা দলের প্রধান জাভাদ হেইরান-নিয়া বলেন, কারিগরি সমস্যার কথা বলে সীমান্তের কার্যক্রম পরিচালনা, প্রশাসনিক জটিলতা, শুল্ক প্রক্রিয়া, বাণিজ্যিক নথি যাচাই, আর্থিক লেনদেন কিংবা নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ জোরদারের মতো বিভিন্ন বিষয় বোঝানো হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতা করে আসছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদের উদ্যোগে ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি হলেও কয়েক দিনের মধ্যেই তা ভেঙে পড়ে। পরে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলো অবরোধ করে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের বন্দরগুলো অবরুদ্ধ থাকায় ২৫ এপ্রিল পাকিস্তানের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটি আদেশ জারি করে। এতে তৃতীয় দেশ থেকে আসা পণ্য ছয়টি নির্ধারিত রুট দিয়ে ট্রাকে করে ইরানে নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। এসব রুটের শেষ গন্তব্য ছিল গাবদ ও তাফতান সীমান্ত।
জুনে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ইলেকট্রনিকভাবে স্বাক্ষর করেন। চুক্তিতে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া, অবরোধ প্রত্যাহার এবং স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে ৬০ দিনের আলোচনা শুরুর কথা ছিল।
তবে প্রায় এক মাসের মধ্যেই সমঝোতাটি কার্যত ভেঙে পড়ে। জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা শুরু করা এবং নৌ অবরোধ চালু রাখার পর চুক্তির কিছু অংশ আর মানতে বাধ্য নয় বলে জানায় ইরান।
এরপর ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞার পরিধি আরও বাড়ায় ওয়াশিংটন। গত ২৪ আগস্ট মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে একটি কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এর আওতায় জাহাজ চলাচল, স্বর্ণ, বিমান পরিবহন ও ডিজিটাল সম্পদ খাতে নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারণ করা হয়।
চলতি মাসের শুরুতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দার খান বলেন, পাকিস্তান প্রযোজ্য সব নিষেধাজ্ঞা মেনে চলবে। তবে কোন কোন নিষেধাজ্ঞার কথা তিনি বলেছেন, তা নির্দিষ্ট করে জানাননি।
পাকিস্তান চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (FPCCI) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইরান ও পাকিস্তানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৮০ কোটি ডলার। এর মধ্যে পাকিস্তানের রপ্তানি ছিল ৬৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ওপর কয়েক দশক ধরে চলা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দুই দেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণের অন্যতম বড় বাধা।
ইরানের সঙ্গে সীমান্তনীতি নির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রের চাপই একমাত্র বিষয় নয়। পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ বেলুচিস্তান দেশটির মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৪৪ শতাংশজুড়ে বিস্তৃত। ২০২৩ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, প্রদেশটির জনসংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। পাকিস্তানের সবচেয়ে দরিদ্র এই প্রদেশে ১৯৪৮ সাল থেকে একাধিক বিদ্রোহ হয়েছে। বেলুচ জাতীয়তাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নেতৃত্বে চলমান বিদ্রোহ প্রায় দুই দশক ধরে অব্যাহত রয়েছে।
এসব গোষ্ঠীর অভিযোগ, স্থানীয় জনগণ বঞ্চিত থাকলেও রাষ্ট্র অঞ্চলটির প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করছে। চলতি বছর বেলুচিস্তানে সশস্ত্র হামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ইসলামাবাদভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাকিস্তান ইনস্টিটিউট ফর কনফ্লিক্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (PICSS) তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে বেলুচিস্তানে ৬২ জন নিরাপত্তাকর্মী নিহত হন। জুনে এ সংখ্যা ছিল ছয়। সেপ্টেম্বরে দেশজুড়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ২২৫টি হামলা চালায়, যা ১২ বছরের মধ্যে কোনো এক মাসে সর্বোচ্চ।
শুক্রবার মাস্তুং জেলায় একটি যাত্রীবাহী গাড়ি থেকে অন্তত ২০ জন পুলিশ সদস্যকে অপহরণ করা হয়। এর দুই দিন পর গোয়াদর জেলায় ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইসের (আইইডি) বিস্ফোরণে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একজন মেজর নিহত হন বলে জানিয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা ইন্টার-সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনস (আইএসপিআর)।
ইরান সীমান্তবর্তী দুর্গম চাগাই জেলাতেও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। চলতি মাসের শুরুতে একটি যাত্রীবাহী কোচ থেকে শুল্ক বিভাগের এক কর্মকর্তাসহ চারজনকে অপহরণ করা হয়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইমতিয়াজ বেলুচ বলেন, পাকিস্তানি কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরেই সীমান্তের দুর্বল নিয়ন্ত্রণকে এসব সহিংসতার কারণ হিসেবে উল্লেখ করে আসছেন। তবে তাঁর মতে, সমস্যাটি শুধু সীমান্ত দিয়ে অবাধ যাতায়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় থাকলেও সীমান্তের দুই পাশে বৃহত্তর পরিসরে তাদের সমন্বিত তৎপরতার সুস্পষ্ট প্রমাণ বর্তমানে নেই।
পাকিস্তানের সীমান্তসংলগ্ন ইরানের সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশেও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর ধারাবাহিক হামলা হচ্ছে।
ইরানি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৯ অক্টোবর জাহেদানের কাছে সড়কের পাশে পুঁতে রাখা বোমার বিস্ফোরণে প্রাদেশিক পুলিশ কমান্ডের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নসরত এফতেখারি নিহত হন। এর কয়েক দিন পর, ১৪ অক্টোবর মেহরেস্তান জেলায় নিজ বাড়ির বাইরে গুলিতে নিহত হন বাসিজ আধাসামরিক বাহিনীর নারী ইউনিটের একজন কমান্ডার। একই জেলায় পুলিশের একটি গাড়িতে পৃথক হামলায় আরেক কর্মকর্তাও নিহত হন বলে জানিয়েছে তাসনিম সংবাদ সংস্থা।
গত বছরের ডিসেম্বরে গঠিত বেলুচ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর একটি জোট এসব হামলার কয়েকটির দায় স্বীকার করেছে। জোটটির প্রধান সদস্য জইশ আল-আদল—২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি সুন্নি বেলুচ সশস্ত্র গোষ্ঠী।
তেহরান দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, জইশ আল-আদল পাকিস্তানের ভূখণ্ড থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করে। তবে ইসলামাবাদ বারবার বলেছে, পাকিস্তানের মাটিতে সংগঠনটির কোনো সাংগঠনিক উপস্থিতি নেই।
জাভাদ হেইরান-নিয়া সতর্ক করে বলেন, পাকিস্তানে সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি থাকা আর নির্দিষ্ট কোনো হামলা চালাতে তাদের সীমান্ত অতিক্রম করার প্রমাণ পাওয়া—দুটি আলাদা বিষয়।
তেহরানভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাইয়েদ রেজা হাশেমি জেবেলির মতে, সীমান্ত এলাকায় ইরানবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা ঠেকাতে পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ চায় তেহরান।
ইরানের অভিযোগ নতুন নয়। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে জইশ আল-আদল ১১ জন ইরানি পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যার দায় স্বীকার করার পর তৎকালীন ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাকিস্তানকে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
২০২৪ সালের ১৬ জানুয়ারি ইরান পাকিস্তানের আরেক সীমান্তবর্তী জেলা পাঞ্জগুরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। পাকিস্তানের দাবি, ওই হামলায় দুই শিশু নিহত হয়েছিল। এর দুই দিন পর পাকিস্তান ইরানের সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশে পাল্টা হামলা চালায়। এতে অন্তত নয়জন নিহত হন। পরে কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে উত্তেজনা কমে আসে এবং দুই দেশ নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়।
জাভাদ হেইরান-নিয়ার মতে, সীমান্ত বন্ধ দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা নতুন পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে। তাঁর ভাষ্য, বিরোধের সমাধান না হলে তেহরান প্রশ্ন তুলতে পারে—ইসলামাবাদ একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা এবং ওয়াশিংটনের চাপ প্রয়োগের কর্মসূচিতে সহযোগিতা করা কতটা সম্ভব।
সূত্র: আল জাজিরা
এমএস/